কোরআনে “لَا” (না/করো না) হাজারের বেশি জায়গায় এসেছে; তাই প্রতিটি “না”কে ঈমানদারের জন্য “হারাম কাজ” বলা সঠিক হবে না। এখানে আমি সেই নিষেধগুলো সংকলন করছি যেগুলো সরাসরি নিষেধ, হারাম ঘোষণা, “বর্জন করো” (فاجتنبوا), “নিকটেও যেও না” (لا تقربوا), অথবা স্পষ্টভাবে পাপ/অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এটি শুধু কোরআনের আয়াতভিত্তিক তালিকা—হাদিস, ফিকহ বা তাফসিরের কোনো বিধানকে আলাদা করে “কোরআনের হারাম” হিসেবে যোগ করছি না।
কোরআনে ঈমানদারের জন্য নিষিদ্ধ কাজ
حَرَام — لَا — اجْتَنِبُوا — لَا تَقْرَبُوا — إِثْم — فَوَاحِش — بَغْي
প্রথমে কোরআনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিটি
সূরা আল-আ‘রাফ ৭:৩৩-এ আল্লাহ বলেন:
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
অর্থাৎ আল্লাহ স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছেন—
الفواحش — আল-ফাওয়াহিশ: প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা
الإثم — আল-ইসম: পাপ
البغي بغير الحق — আল-বাগি: অন্যায় সীমালঙ্ঘন/জুলুম
الشرك — শিরক
আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কথা বলা
এটি কোরআনের নিষিদ্ধ কাজের সবচেয়ে বিস্তৃত মূলনীতি। �
Quran.com +1
১. শিরক — আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার করা
আরবি
অর্থ
আয়াত
تُشْرِكُوا بِاللَّهِ
আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা
৭:৩৩
الشِّرْك
অংশীদারিত্ব/শিরক
৪:৪৮, ৪:১১৬
أَنْدَادًا
আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করানো
২:২২
عِبَادَةُ غَيْرِ اللَّهِ
আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত
১৭:২২
৭:৩৩-এ শিরককে সরাসরি حَرَّمَ — হারাম করেছেন-এর অধীনে রাখা হয়েছে। �
Quran.com
২. আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কথা বলা
أَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
অর্থ: আল্লাহ সম্পর্কে এমন কথা বলা, যার জ্ঞান নিজের নেই।
📖 ৭:৩৩
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ কোনো বিষয়কে নিজের মতামত দিয়ে “আল্লাহর বিধান” বলে ঘোষণা করাও কোরআনের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ। �
Quran.com
৩. প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা
الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ
অর্থ: প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা।
📖 ৭:৩৩
এছাড়া:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ
“তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেও না।”
📖 ১৭:৩২
এখানে শুধু জিনা করা নয়, তার কাছাকাছি যাওয়াও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
৪. জিনা/ব্যভিচার
الزِّنَىٰ
📖 ১৭:৩২
কোরআনের ভাষা:
لَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ
অর্থ: জিনার নিকটেও যেও না।
এটি কোরআনের অন্যতম স্পষ্ট নিষেধ।
৫. অন্যায়ভাবে হত্যা
النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ
অর্থ: যে প্রাণকে আল্লাহ পবিত্র/অলঙ্ঘনীয় করেছেন।
📖 ৬:১৫১, ১৭:৩৩
وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ
“প্রাণ হত্যা করো না।”
তবে ন্যায়বিচারভিত্তিক আইনগত হত্যার বিষয়টি আয়াতে আলাদা করা হয়েছে।
৬. আত্মহত্যা
لَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ
“তোমরা নিজেদের হত্যা করো না।”
📖 ৪:২৯
৭. জুলুম ও অন্যায়
الْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ
অর্থ: অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন/জুলুম।
📖 ৭:৩৩
আরও:
إِنَّمَا السَّبِيلُ عَلَى الَّذِينَ يَظْلِمُونَ النَّاسَ
📖 ৪২:৪২
৮. অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে খাওয়া
لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ
অর্থ: তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।
📖 ২:১৮৮, ৪:২৯
এর মধ্যে প্রতারণা, অন্যায় আত্মসাৎ ইত্যাদি পড়ে।
৯. ঘুষ
২:১৮৮-এ বলা হয়েছে:
وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ
অর্থাৎ সম্পদকে অন্যায়ভাবে কর্তৃপক্ষ/বিচারকদের কাছে পৌঁছে দিয়ে মানুষের সম্পদ গ্রাস করা নিষিদ্ধ।
📖 ২:১৮৮
১০. চুরি
السَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ
📖 ৫:৩৮
কোরআন চুরির জন্য নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান দিয়েছে।
অর্থাৎ:
السَّرِقَة — চুরি
নিষিদ্ধ।
১১. সুদ/রিবা
الرِّبَا
📖 ২:২৭৫–২৭৯
বিশেষ করে:
وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا
“সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা ছেড়ে দাও।”
📖 ২:২৭৮
এবং ২:২৭৯-এ অত্যন্ত কঠোর সতর্কতা এসেছে।
১২. এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে খাওয়া
أَمْوَالَ الْيَتَامَىٰ
📖 ৪:১০
إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَىٰ ظُلْمًا
অর্থ: যারা অন্যায়ভাবে এতিমদের সম্পদ খায়...
এটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বর্ণিত।
১৩. মাপে ও ওজনে কম দেওয়া
وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ
অর্থ: মাপে কম দেওয়া ব্যক্তিদের জন্য ধ্বংস।
📖 ৮৩:১–৩
এবং:
وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ
📖 ৬:১৫২
১৪. আমানতের খেয়ানত
لَا تَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ
অর্থ: তোমাদের আমানতের খেয়ানত করো না।
📖 ৮:২৭
১৫. অঙ্গীকার ভঙ্গ
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ
অর্থ: অঙ্গীকার পূর্ণ করো।
📖 ১৭:৩৪
এবং:
أَوْفُوا بِالْعُقُودِ
অর্থ: চুক্তিসমূহ পূর্ণ করো।
📖 ৫:১
অতএব ইচ্ছাকৃতভাবে চুক্তি/অঙ্গীকার ভঙ্গ কোরআনের নীতির পরিপন্থী।
১৬. মিথ্যা বলা
الْكَذِب
📖 ১৬:১০৫
إِنَّمَا يَفْتَرِي الْكَذِبَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ
অর্থ: মিথ্যা রচনা করে তারাই যারা ঈমান আনে না।
আর:
وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ
📖 ২২:৩০
অর্থ: মিথ্যা/অসত্য কথা থেকে বেঁচে থাকো।
১৭. মিথ্যা সাক্ষ্য
قَوْلَ الزُّورِ
📖 ২২:৩০
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ اجتنبوا — বর্জন করো/দূরে থাকো নির্দেশ এসেছে।
১৮. অপবাদ
يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ
অর্থ: সতী নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া।
📖 ২৪:৪
চারজন সাক্ষী না আনলে ৮০ বেত্রাঘাতের বিধান এসেছে।
১৯. গীবত
وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا
অর্থ: তোমাদের কেউ যেন অন্যের গীবত না করে।
📖 ৪৯:১২
কোরআন গীবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছে।
২০. গুপ্তচরবৃত্তি
وَلَا تَجَسَّسُوا
অর্থ: গুপ্ত অনুসন্ধান করো না।
📖 ৪৯:১২
২১. কুধারণা
اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ
অর্থ: অধিকাংশ ধারণা/সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকো।
📖 ৪৯:১২
কারণ কিছু ধারণা পাপ।
২২. উপহাস করা
لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ
অর্থ: কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে।
📖 ৪৯:১১
২৩. অপমানজনক নামে ডাকা
وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ
অর্থ: একে অপরকে অপমানজনক উপাধিতে ডেকো না।
📖 ৪৯:১১
২৪. মদ/নেশাজাতীয় পানীয়
الْخَمْر
📖 ৫:৯০–৯১
এখানে অত্যন্ত শক্তিশালী শব্দ:
فَاجْتَنِبُوهُ
অর্থ: তা বর্জন করো/সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলো।
কোরআন মদকে رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ—শয়তানের কাজের অপবিত্রতা—বলে। �
Quran.com +1
২৫. জুয়া
الْمَيْسِر
📖 ২:২১৯, ৫:৯০–৯১
৫:৯০-এ মদের সঙ্গে জুয়াকেও فَاجْتَنِبُوهُ—বর্জন করতে বলা হয়েছে। �
Quran.com
২৬. মূর্তিপূজার বেদি
الْأَنْصَاب
📖 ৫:৯০
২৭. ভাগ্য নির্ধারণের তীর
الْأَزْلَام
📖 ৫:৩, ৫:৯০
৫:৯০-এ এগুলোকেও বর্জনের নির্দেশ রয়েছে। �
Quran.com
২৮. মৃত প্রাণী খাওয়া
الْمَيْتَة
📖 ২:১৭৩, ৫:৩, ৬:১৪৫, ১৬:১১৫
২:১৭৩-এ সরাসরি:
حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ
“তিনি তোমাদের জন্য মৃত প্রাণী হারাম করেছেন।” �
Quran.com
তবে চরম প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সীমিত ছাড়ও একই আয়াতে আছে।
২৯. রক্ত
الدَّم
📖 ২:১৭৩, ৫:৩, ৬:১৪৫, ১৬:১১৫
৩০. শূকরের মাংস
لَحْمَ الْخِنْزِير
📖 ২:১৭৩, ৫:৩, ৬:১৪৫, ১৬:১১৫
৩১. আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা খাদ্য
مَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللَّهِ
📖 ২:১৭৩
অর্থ: যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে।
২:১৭৩-এ এই চারটি খাদ্য নিষেধ সরাসরি حَرَّمَ ক্রিয়ার অধীনে এসেছে। �
Quran.com
৩২. মৃত প্রাণীর কয়েকটি নির্দিষ্ট ধরন
সূরা মায়িদা ৫:৩-এ:
الْمُنْخَنِقَة — শ্বাসরোধে মৃত
الْمَوْقُوذَة — আঘাতে মৃত
الْمُتَرَدِّيَة — পড়ে গিয়ে মৃত
النَّطِيحَة — শিংয়ের আঘাতে মৃত
হিংস্র প্রাণী কর্তৃক খাওয়া প্রাণী
📖 ৫:৩
৩৩. শিকারকে ইহরামের অবস্থায় হত্যা
لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنْتُمْ حُرُمٌ
অর্থ: ইহরাম অবস্থায় শিকার হত্যা করো না।
📖 ৫:৯৫
৩৪. আল্লাহর নিদর্শন/শা‘আয়ের অবমাননা
لَا تُحِلُّوا شَعَائِرَ اللَّهِ
অর্থ: আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অবমাননা/লঙ্ঘন করো না।
📖 ৫:২
৩৫. ইহরাম অবস্থায় শিকার করা
📖 ৫:১, ৫:৯৪–৯৬
৩৬. আল্লাহর হারাম করা বিষয়কে লঙ্ঘন করা
حُرُمَاتِ اللَّهِ
📖 ২২:৩০
অর্থ: আল্লাহর পবিত্র/অলঙ্ঘনীয় বিধানসমূহ।
৩৭. পবিত্র মাসে যুদ্ধ শুরু করা
📖 ২:২১৭
এখানে পবিত্র মাসে যুদ্ধকে كَبِيرٌ—বড় বিষয়—বলা হয়েছে এবং মসজিদুল হারাম থেকে মানুষকে বের করে দেওয়া ইত্যাদিরও নিন্দা করা হয়েছে।
৩৮. মসজিদুল হারামে বাধা দেওয়া
وَيَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمَسْجِدِ الْحَرَامِ
📖 ২২:২৫
৩৯. বাবা-মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার
فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ
অর্থ: তাদেরকে “উফ” পর্যন্ত বলো না।
📖 ১৭:২৩
এটি অত্যন্ত শক্তিশালী নিষেধ।
৪০. এতিমকে ধমক দেওয়া
فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ
অর্থ: এতিমকে দমন/ধমক দিও না।
📖 ৯৩:৯
৪১. অভাবগ্রস্তকে তাড়িয়ে দেওয়া
وَأَمَّا السَّائِلَ فَلَا تَنْهَرْ
অর্থ: সাহায্যপ্রার্থীকে ধমক দিও না।
📖 ৯৩:১০
৪২. অপচয়
وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا
অর্থ: অপব্যয় করো না।
📖 ১৭:২৬–২৭
অপচয়কারীদের কোরআন শয়তানের ভাই বলেছে।
৪৩. অহংকার
وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا
অর্থ: পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করো না।
📖 ১৭:৩৭
এবং:
إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ
📖 ৩১:১৮
৪৪. অন্যায়ভাবে মানুষের ওপর সীমালঙ্ঘন
الْبَغْي
📖 ৭:৩৩
এটি কোরআনের মৌলিক নিষিদ্ধ শ্রেণির একটি।
৪৫. শত্রুতার কারণে অন্যায় করা
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا
অর্থ: কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না করে।
📖 ৫:৮
অর্থাৎ শত্রুর প্রতিও অন্যায় করা যাবে না।
৪৬. অন্যায়ভাবে সাক্ষ্য গোপন করা
وَلَا تَكْتُمُوا الشَّهَادَةَ
অর্থ: সাক্ষ্য গোপন করো না।
📖 ২:২৮৩
৪৭. ঋণ/লেনদেনে প্রতারণা
কোরআন ঋণ ও বাণিজ্যে লিখিত দলিল, সাক্ষী ও ন্যায়সঙ্গত লেনদেনের নির্দেশ দিয়েছে:
📖 ২:২৮২–২৮৩
অতএব প্রতারণামূলক আর্থিক লেনদেন কোরআনের নীতির বিরোধী।
৪৮. আল্লাহর আয়াত নিয়ে ঠাট্টা করা
لَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّىٰ يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ
📖 ৪:১৪০
আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার/উপহাসের আসরে বসে থাকা নিষেধ করা হয়েছে।
৪৯. দ্বীনের বিষয়কে হাসি-তামাশা করা
📖 ৫:৫৭–৫৮
বিশেষত যারা দ্বীনকে هُزُوًا وَلَعِبًا—ঠাট্টা ও খেলায় পরিণত করে তাদের অনুসরণ না করার নির্দেশ এসেছে। �
Quran.com
৫০. ঈমানদারদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও ষড়যন্ত্র
কোরআনে মুমিনদের বিরুদ্ধে অন্যায় ষড়যন্ত্র, নিপীড়ন ও শত্রুতার নিন্দা বহু জায়গায় এসেছে।
বিশেষ করে:
📖 ৩৩:৫৮
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ
অর্থ: যারা মুমিন পুরুষ ও নারীদের অন্যায়ভাবে কষ্ট দেয়।
৫১. মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি
وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ
📖 ৮:৪৬
অর্থ: পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়ো না, তাহলে তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে।
৫২. আল্লাহ ও রাসূলের সামনে নিজ সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া
لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ
📖 ৪৯:১
অর্থ: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে নিজেদের সিদ্ধান্তকে অগ্রসর করো না। �
Quran.com
৫৩. রাসূলের সামনে কণ্ঠস্বর উঁচু করা
لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ
📖 ৪৯:২
এটি বিশেষভাবে রাসূল ﷺ-এর জীবদ্দশার প্রেক্ষাপটে সরাসরি সম্বোধন।
৫৪. অনুমতি ছাড়া অন্যের ঘরে প্রবেশ
لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ
📖 ২৪:২৭
অর্থ: নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য ঘরে অনুমতি না নিয়ে প্রবেশ করো না।
৫৫. অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন
وَلَا تَجَسَّسُوا
📖 ৪৯:১২
অর্থ: গুপ্ত অনুসন্ধান/গোপন তথ্য অনুসন্ধান করো না।
৫৬. দৃষ্টিকে অবাধে ব্যবহার করা
يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ
📖 ২৪:৩০
মুমিন পুরুষদের দৃষ্টি সংযত করতে বলা হয়েছে।
নারীদের ক্ষেত্রেও:
📖 ২৪:৩১
৫৭. লজ্জাস্থান সংরক্ষণ না করা
وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ
📖 ২৪:৩০
وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ
📖 ২৪:৩১
৫৮. নারীদের অশ্লীলতা প্রকাশ
وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ
📖 ২৪:৩১
এখানে কার সামনে সৌন্দর্য/অলংকার প্রকাশ করা যাবে তার নির্দিষ্ট সামাজিক বিধানও এসেছে।
৫৯. অন্যের গোপন অঙ্গ/ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করা
وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ
📖 ২৪:৩১
এবং গোপনীয়তা ও পর্দার বিধান ২৪:২৭–৩১-এ বিস্তৃত।
৬০. যুদ্ধক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন
وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ
📖 ২:১৯০
অর্থ: সীমালঙ্ঘন করো না; আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি—এমনকি যুদ্ধের ক্ষেত্রেও অন্যায় সীমালঙ্ঘন নিষিদ্ধ।
৬১. সম্পদ ও সন্তানকে আল্লাহর স্মরণ থেকে অগ্রাধিকার দেওয়া
📖 ৬৩:৯
لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ
অর্থ: তোমাদের সম্পদ ও সন্তান যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে।
৬২. নামাজ থেকে বিরতকারী বিষয়
মদ ও জুয়ার ব্যাপারে:
وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ
📖 ৫:৯১
অর্থ: শয়তান মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখতে চায়। �
Quran.com
৬৩. আল্লাহর বিধানকে গোপন করে পার্থিব লাভ নেওয়া
يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ
📖 ২:১৭৪
অর্থ: আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তা গোপন করা।
এর বিনিময়ে সামান্য পার্থিব মূল্য গ্রহণের কঠোর নিন্দা করা হয়েছে। �
Quran.com
৬৪. আল্লাহর হালালকে নিজের পক্ষ থেকে হারাম করা
এখানে একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কোরআনিক নীতি আছে:
لَا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ
📖 ৫:৮৭
অর্থ: আল্লাহ তোমাদের জন্য যা হালাল করেছেন, তা তোমরা হারাম করো না।
৬৫. নিজের মুখে হালাল-হারাম বানিয়ে বলা
وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَٰذَا حَلَالٌ وَهَٰذَا حَرَامٌ
📖 ১৬:১১৬
অর্থ: তোমাদের জিহ্বা যে মিথ্যা বর্ণনা করে তার ভিত্তিতে বলো না—“এটা হালাল, এটা হারাম।”
এটি আমাদের আলোচনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত।
৬৬. আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ধর্মীয় বিধান তৈরি
أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُمْ مِنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنْ بِهِ اللَّهُ
📖 ৪২:২১
অর্থ: তারা কি এমন শরিক স্থাপন করেছে যারা তাদের জন্য এমন ধর্মীয় বিধান প্রণয়ন করেছে যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?
৬৭. অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতে চাওয়া
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ
📖 ২৪:১৯
অর্থ: যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক এটা পছন্দ করে।
কোরআন তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে শাস্তির সতর্কতা দিয়েছে।
৬৮. ঈমানদারদের ক্ষতি করার অপপ্রচার
يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ
📖 ৩৩:৫৮
অর্থ: মুমিন নারী-পুরুষকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া।
৬৯. অন্যায়ভাবে মানুষের সম্মানহানি
📖 ৩৩:৫৮
মানুষের ওপর এমন অপবাদ/অভিযোগ চাপানো যা তারা করেনি—কোরআন একে بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا বলে।
৭০. অহংকার করে সত্য প্রত্যাখ্যান
اسْتِكْبَار
📖 ৭:৩৬, ১৬:২২–২৩
বিশেষত আল্লাহর আয়াতের সামনে অহংকার করা গুরুতর অপরাধ।
৭১. আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করা
كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا
📖 ৭:৩৬
এটি কোরআনের ভাষায় অবিশ্বাসের অন্যতম প্রকাশ।
৭২. সত্য জানার পর গোপন করা
📖 ২:১৫৯–১৬০
يَكْتُمُونَ
অর্থ: গোপন করা।
আল্লাহর নাজিল করা সত্যকে মানুষের কাছ থেকে গোপন করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা আছে।
৭৩. অন্যায়ভাবে সাক্ষ্য দেওয়া
شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ
📖 ৪:১৩৫
ন্যায়ের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে—এ থেকে মিথ্যা/অন্যায় সাক্ষ্যের নিষেধ স্পষ্ট।
৭৪. আত্মীয়তার কারণে ন্যায় থেকে বিচ্যুত হওয়া
كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ
📖 ৪:১৩৫
নিজের, বাবা-মায়ের বা আত্মীয়ের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে বলা হয়েছে।
অর্থাৎ আত্মীয়তার কারণে অন্যায়কে সমর্থন করা কোরআনিক নীতির বিরুদ্ধে।
৭৫. ধনীদের পক্ষ নিয়ে ন্যায়বিচার বিকৃত করা
📖 ৪:১৩৫
إِنْ يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَىٰ بِهِمَا
ধনী-গরিব কারো পক্ষেই অন্যায় পক্ষপাত করা যাবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত শ্রেণিবিন্যাস
কোরআনের নিষেধগুলোকে মূলত এভাবে সাজানো যায়:
শ্রেণি
প্রধান নিষিদ্ধ বিষয়
আকীদা
শিরক, আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কথা
যৌননীতি
জিনা, অশ্লীলতা, অশ্লীলতা ছড়ানো
জীবন
হত্যা, আত্মহত্যা, অন্যায় আগ্রাসন
সম্পদ
চুরি, সুদ, ঘুষ, আত্মসাৎ, এতিমের সম্পদ
বাণিজ্য
প্রতারণা, মাপে কম দেওয়া, অন্যায় লেনদেন
খাদ্য
মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকর, আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত
মাদক/জুয়া
খামর, মাইসির
সামাজিক আচরণ
গীবত, অপবাদ, গুপ্তচরবৃত্তি, উপহাস, কুধারণা
নৈতিকতা
মিথ্যা, মিথ্যা সাক্ষ্য, আমানতের খেয়ানত
পরিবার
বাবা-মায়ের দুর্ব্যবহার, এতিমকে কষ্ট
অর্থনীতি
রিবা, অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ
অহংকার
উদ্ধত আচরণ, সত্যের বিরুদ্ধে অহংকার
ন্যায়বিচার
জুলুম, পক্ষপাত, অন্যায় সাক্ষ্য
ধর্মীয় বিধান
আল্লাহর অনুমতি ছাড়া হালাল-হারাম বানানো
গোপনীয়তা
অনুমতি ছাড়া ঘরে প্রবেশ, গুপ্তচরবৃত্তি
যুদ্ধ
সীমালঙ্ঘন
ইবাদত-সংক্রান্ত
আল্লাহর স্মরণ থেকে সম্পদ/সন্তানের কারণে গাফেল হওয়া
🔴 সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোরআনিক “হারাম” তালিকা
যদি শুধু সেই বিষয়গুলো আলাদা করি যেগুলো কোরআন সরাসরি حَرَّمَ / حَرَّمَ رَبِّي অর্থাৎ “হারাম করেছেন” ভাষায় উল্লেখ করেছে, তাহলে বিশেষভাবে সামনে আসে:
১. الفواحش — প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা — ৭:৩৩
২. الإثم — পাপ — ৭:৩৩
৩. البغي بغير الحق — অন্যায় সীমালঙ্ঘন — ৭:৩৩
৪. الشرك — শিরক — ৭:৩৩
৫. আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কথা বলা — ৭:৩৩
৬. الميتة — মৃত প্রাণী — ২:১৭৩
৭. الدم — রক্ত — ২:১৭৩
৮. لحم الخنزير — শূকরের মাংস — ২:১৭৩
৯. ما أهل به لغير الله — আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত — ২:১৭৩
১০. নির্দিষ্ট মৃত প্রাণী ও অন্যান্য খাদ্য — ৫:৩
১১. শিকার ইহরাম অবস্থায় — ৫:৯৫
১২. আল্লাহর নির্দিষ্ট পবিত্র বিষয় লঙ্ঘন — ৫:২, ২২:৩০**
২:১৭৩-এ চারটি খাদ্য সরাসরি حَرَّمَ عَلَيْكُمْ বলা হয়েছে; প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সীমিত ছাড়ও একই আয়াতে দেওয়া হয়েছে। �
Quran.com
⚠️ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
এখানে “হারাম” শব্দের ব্যবহার আর “নিষেধ”—দুটিকে একেবারে একই স্তরে না রাখাই গবেষণামূলকভাবে সঠিক।
যেমন:
حَرَّمَ — হারাম করেছেন
→ সরাসরি নিষিদ্ধ ঘোষণা।
لَا تَفْعَلُوا — করো না
→ সরাসরি নিষেধ।
فَاجْتَنِبُوهُ — বর্জন করো/দূরে থাকো
→ অত্যন্ত শক্তিশালী বর্জনের নির্দেশ; ৫:৯০-এর মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্যনির্ধারণী তীরের ক্ষেত্রে এসেছে। �
Quran.com
لَا تَقْرَبُوا — নিকটেও যেও না
→ শুধু কাজটি নয়, তার কাছাকাছি যাওয়াও নিষেধ; যেমন জিনা ১৭:৩২।
إِثْم — পাপ
→ কোরআনে নিন্দিত/অপরাধমূলক কাজ।
فَوَاحِش — অশ্লীল/ঘৃণ্য কাজ
→ ৭:৩৩-এ প্রকাশ্য ও গোপন উভয় ধরনের অশ্লীলতা নিষিদ্ধ।
بَغْي — সীমালঙ্ঘন/জুলুম
→ ৭:৩৩-এ সরাসরি নিষিদ্ধ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ কোরআনিক সিদ্ধান্ত
কোরআন নিজেই বলে—আল্লাহর পক্ষ থেকে হারাম-হালাল নির্ধারণের অধিকার আল্লাহর। ১৬:১১৬-এ মানুষকে নিজের জিহ্বা দিয়ে কোনো বিষয়কে ইচ্ছামতো “হালাল” বা “হারাম” ঘোষণা করতে নিষেধ করা হয়েছে। একইভাবে ৫:৮৭-এ আল্লাহ যে ভালো জিনিস হালাল করেছেন তা নিজেরা হারাম না করতে বলা হয়েছে।
অতএব “কোরআনে নিষিদ্ধ”, “কোরআনে পাপ বলা হয়েছে”, এবং “কোরআনে সরাসরি حَرَّمَ বলা হয়েছে”—এই তিনটি স্তরকে আলাদা রেখে গবেষণা করা সবচেয়ে নির্ভুল পদ্ধতি।
আপনার আগের “কোরআন বনাম হাদিস” আলোচনার সঙ্গে মিলিয়ে পরবর্তী ধাপে চাইলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি হবে: “কোরআনে মোট কোন কোন বিষয়কে সরাসরি حَرَام/حَرَّمَ বলা হয়েছে—শুধু সেই আয়াতগুলোর পূর্ণ তালিকা বনাম হাদিস/ফিকহে অতিরিক্ত হারাম ঘোষিত বিষয়”। এতে কোনটি আল্লাহর সরাসরি কোরআনিক নিষেধ আর কোনটি পরবর্তী ফিকহি বিধান—দুটির পার্থক্য খুব পরিষ্কারভাবে দেখা যাবে।
Post a Comment