Top News

ওষুধ শিল্পের অরাজকতা: মুনাফার যুদ্ধে জিম্মি বাংলাদেশের রোগীরা, চিকিৎসা নয়, চলছে বিপণনের প্রতিযোগিতা

ওষুধ শিল্পের অরাজকতা: মুনাফার যুদ্ধে জিম্মি বাংলাদেশের রোগীরা, চিকিৎসা নয়, চলছে বিপণনের প্রতিযোগিতা

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প একসময় দেশের অন্যতম সফল শিল্পখাত হিসেবে পরিচিত ছিল। দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধের চাহিদা দেশীয় কোম্পানিগুলো পূরণ করছে এবং বিশ্বের বহু দেশে ওষুধ রপ্তানিও হচ্ছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে আজ ভয়াবহ এক বাস্তবতা লুকিয়ে আছে—ওষুধের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, অনৈতিক বিপণন, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রোগীদের ওপর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে একজন সাধারণ মানুষ যখন চিকিৎসকের কাছে যান, তখন শুধু রোগ নয়, তাকে লড়াই করতে হয় প্রেসক্রিপশনের দীর্ঘ তালিকা, অপ্রয়োজনীয় টেস্ট এবং ব্যয়বহুল ওষুধের সঙ্গে।

কেন বাড়ছে ওষুধের দাম?

প্রশ্ন হচ্ছে—কাঁচামালের ওপর শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে, উৎপাদন প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, তারপরও কেন কমছে না ওষুধের দাম?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম কারণ হলো ওষুধ কোম্পানিগুলোর আক্রমণাত্মক বিপণন ব্যয়।

আজ দেশের প্রায় প্রতিটি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চিকিৎসকের চেম্বারে ওষুধ কোম্পানির শত শত মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ (এমআর) কাজ করছেন। তাদের মূল লক্ষ্য চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ওষুধ লিখিয়ে নেওয়া।

এই প্রতিযোগিতা এখন তথ্যভিত্তিক বিপণনের সীমা ছাড়িয়ে অনৈতিক সুবিধা প্রদানের পর্যায়ে পৌঁছেছে।

প্রেসক্রিপশন কেন ছবি তোলা হয়?

দেশের প্রায় সব বড় হাসপাতালের সামনে একটি সাধারণ দৃশ্য দেখা যায়—রোগী চেম্বার থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন প্রতিনিধি প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

অনেক রোগী মনে করেন এটি হয়তো গবেষণা বা তথ্য সংগ্রহের জন্য।

বাস্তবে বিষয়টি হলো, কোম্পানি নিশ্চিত হতে চায় যে যেসব চিকিৎসকের পেছনে তারা বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, তারা সেই কোম্পানির ওষুধ লিখছেন কিনা।

অর্থাৎ প্রেসক্রিপশন এখন চিকিৎসার নথি নয়, অনেক ক্ষেত্রে বিপণন কার্যক্রমের পরিমাপের হাতিয়ার হয়ে গেছে।

অনৈতিক সুবিধার ভয়ংকর সংস্কৃতি

একসময় চিকিৎসকদের দেওয়া হতো কলম, ডায়েরি কিংবা ওষুধের নমুনা।

বর্তমানে অভিযোগ রয়েছে—

• বিদেশ সফর ও সেমিনার স্পন্সর করা

• দামি মোবাইল, ফ্রিজ, টিভি, এসি প্রদান

• গাড়ি, প্লট, ফ্ল্যাটসহ উচ্চমূল্যের সুবিধা দেওয়া

• বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রণোদনা প্রদান

যদিও সব চিকিৎসক এই সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত নন, কিন্তু কিছু অনৈতিক চর্চা পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কে?

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা।

কারণ কোম্পানির বিপুল বিপণন ব্যয় শেষ পর্যন্ত ওষুধের দামের মধ্যেই যুক্ত হয়।

অর্থাৎ একজন রোগী ওষুধ কেনার সময় শুধু ওষুধের উৎপাদন খরচই বহন করেন না; অনেক ক্ষেত্রে তিনি বহন করেন বিপণন ব্যয়, কমিশন, উপহার এবং বাজার দখলের প্রতিযোগিতার খরচও।

অপ্রয়োজনীয় টেস্টের অভিযোগ

দেশের বহু রোগী অভিযোগ করেন, একই রোগের জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে গেলে ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষা দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সব ক্ষেত্রেই না হলেও কিছু ক্ষেত্রে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও চিকিৎসকদের মধ্যে আর্থিক স্বার্থের সম্পর্ক রোগীর ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।

যদি এটি সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু অনৈতিক নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও বিপজ্জনক।

সরকারের নিয়ন্ত্রণ কোথায়?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা জারি করেছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো—

• প্রেসক্রিপশন ছবি তোলা বন্ধ হয়নি

• এমআরদের চেম্বারভিত্তিক চাপ কমেনি

• ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি থামেনি

• অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখার অভিযোগ কমেনি

আইন থাকলেই হবে না; তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

জেনেরিক প্রেসক্রিপশন কি সমাধান?

অনেকে মনে করেন, চিকিৎসকরা যদি শুধু জেনেরিক নাম লিখেন, তাহলে দাম কমে যাবে।

কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এতে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে।

কারণ অনেক ফার্মেসি বেশি লাভের আশায় নিম্নমানের বা কম পরিচিত কোম্পানির ওষুধ রোগীর হাতে তুলে দিতে পারে।

তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, আপাতত জেনেরিক নামের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।

এখন কী করা প্রয়োজন?

১. চিকিৎসকদের জন্য বাধ্যতামূলক উপহার ও আর্থিক সুবিধা প্রকাশ নীতি প্রণয়ন।

২. প্রেসক্রিপশন ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে কার্যকর মনিটরিং।

৩. ওষুধ কোম্পানির বিপণন ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ।

৪. ওষুধের মূল্য নির্ধারণে স্বাধীন কমিশন গঠন।

৫. রোগী অধিকার সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন।

৬. ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও চিকিৎসকদের আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

৭. স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি ও স্বার্থের সংঘাত তদন্তে বিশেষ সেল গঠন।

৮. ওষুধ শিল্প সমিতির মাধ্যমে অনৈতিক বিপণনবিরোধী আচরণবিধি বাস্তবায়ন।

শেষ কথা

স্বাস্থ্যসেবা কোনো পণ্য নয়, এটি একটি মৌলিক মানবিক অধিকার।

যখন একজন অসুস্থ মানুষ চিকিৎসকের কাছে যান, তখন তিনি ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার অংশ হতে যান না; তিনি যান সুস্থ হওয়ার আশায়।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প দেশের গর্ব। কিন্তু সেই গর্ব টিকিয়ে রাখতে হলে রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

আজ সময় এসেছে প্রশ্ন করার—

আমরা কি রোগীর চিকিৎসা করছি, নাকি প্রেসক্রিপশনকে বাজার দখলের অস্ত্র বানিয়ে ফেলছি?

রোগীর জীবন ও অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

পোস্টের শেষে হ্যাশট্যাগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন:

#ওষুধ_শিল্প #স্বাস্থ্যখাত #রোগীর_অধিকার #DrugMarketing 

#MedicalEthics 

#বাংলাদেশ 

#স্বাস্থ্যনীতি 

#PharmaceuticalIndustry 

#দুর্নীতি_বিরোধী 

#জনস্বাস্থ্য 

#HealthcareReform 

#MedicinePrice 

#BangladeshHealthSector 

#GiasThoughts

#GiasBlog101

Post a Comment

Previous Post Next Post